
ছোটগল্প
- উজান স্রোতে: এই গল্প সময় ও স্রোতের বিপরীতে হাঁটার এক নিঃশব্দ আখ্যান। দিশাহীন শৈশব, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের অপব্যবহার ও অপ্রত্যাশিত মানবিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে গল্পটি এগোয়। নদীর উদার বিস্তার ও প্রকৃতির উপস্থিতি মানুষের নৈতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। একদিকে প্রকৃতির উষ্ণতা, অন্যদিকে আধুনিক মানুষের দায়হীনতা—এই দ্বন্দ্বেই গল্পের কেন্দ্র। শেষ পর্যন্ত পাঠককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়—প্রজন্মের দায় কার?
- অভির অভিমান: অভিমান এখানে কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, বরং সম্পর্কের ভাষা। গল্পটি একটি নীরব সম্পর্কের ভেতরের চাপা টানাপোড়েনকে তুলে ধরে। কথার অভাব, না-বলা কথার ভার আর ভুল বোঝাবুঝির মধ্যেই চরিত্রদের দূরত্ব তৈরি হয়। খুব সাধারণ ঘটনাপ্রবাহের ভেতর দিয়ে গল্পটি মানুষের অহং, ভালোবাসা ও আত্মসম্মানের সূক্ষ্ম সংঘর্ষকে ধরেছে।
- ষষ্ঠেন্দ্রিয়: এই গল্প দৃশ্যমান বাস্তবতার বাইরে থাকা এক অদৃশ্য অনুভূতির অনুসন্ধান। মানুষ কীভাবে নিজের শিকড়ের সন্ধানে ছুটে যায় এক অমোঘ সত্যের টানে, কীভাবে মাটির আকর্ষণ অনুভব করে দেশকালের ঊর্ধ্বে উঠে —তারই মনস্তাত্ত্বিক অন্বেষণ। যুক্তি আর অবচেতনের সীমারেখা এখানে ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। গল্পটি দেখায়, সব সত্য চোখে দেখা যায় না; কিছু সত্য অনুভব করতে হয়।
- অথ কূর্ম কথা: প্রকৃতি ও সমাজের ছায়ায় লেখা এক দার্শনিক গল্প। কচ্ছপ এখানে নিছক প্রাণী নয়, বরং ধৈর্য, ধারাবাহিকতা ও প্রজন্মগত দায়িত্বের প্রতীক। মানুষের ক্ষণস্থায়ী লোভ আর প্রকৃতির দীর্ঘ সময়বোধের মধ্যে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি হয়। গল্পটি নিঃশব্দে মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতি আশ্রয় দেয়, মানুষ নয়।
- উজান বেয়ে: এই গল্প ফিরে তাকানোর। সময়ের বিপরীতে যাত্রা করে মানুষ যখন নিজের শিকড়ে পৌঁছতে চায়, তখন যে মানসিক দ্বন্দ্ব তৈরি হয়—তারই আখ্যান। স্মৃতি, অনুশোচনা আর না-পাওয়ার বেদনা গল্পটিকে আবৃত করে রাখে। ‘উজান বেয়ে’ হাঁটা এখানে প্রতীক—নিজের সত্যের দিকে ফিরে যাওয়ার।
- সুজানগড়ের মেয়ে: এক প্রান্তিক ভূগোল ও এক প্রান্তিক নারীর গল্প। সামাজিক কাঠামো, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টি এবং ব্যক্তিগত স্বপ্ন—এই তিনের সংঘাতে গড়ে ওঠে গল্পটি। ‘সুজানগড়ের মেয়ে’ শুধু একজন নারী নয়, বরং একটি এলাকার, একটি শ্রেণির প্রতীক। গল্পটি নীরবে প্রশ্ন তোলে—নারীর পরিচয় কি তার জন্মস্থান আর পরিস্থিতি দিয়েই নির্ধারিত?
- কাবিনীর কবিয়াল: লোকসংস্কৃতি, স্মৃতি ও জমির অধিকারের গল্প। এক কবিয়ালের জীবন দিয়ে গল্পটি সময়ের পরিবর্তন এবং সংস্কৃতির অবক্ষয়কে তুলে ধরে। একসময় যে কণ্ঠ মানুষের ভিড় টানত, আজ সে কণ্ঠ নিঃশব্দ। গল্পটি শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি আমাদের শিকড়ের প্রতি দায়বদ্ধ?
- অকাল বোধন: এই গল্প আত্মজাগরণের, কিন্তু নির্ধারিত সময়ের বাইরে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা চরিত্রকে তার নিজস্ব বিশ্বাস, ভয় ও নৈতিকতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। গল্পের নামের মতোই, এখানে বোধন আসে অপ্রস্তুত মুহূর্তে। পাঠক বুঝতে পারে—সব উপলব্ধি উৎসবের সময়ে আসে না, কিছু উপলব্ধি আসে সংকটের ভেতর দিয়ে।
- চেকমেট: ক্ষমতা, বুদ্ধি আর নিয়ন্ত্রণের খেলা এই গল্পের মূল উপজীব্য। দাবা এখানে শুধু একটি খেলা নয়, বরং জীবনের রূপক। চরিত্ররা নিজেদের চাল চালতে গিয়ে বুঝতে পারে—সবচেয়ে নিখুঁত পরিকল্পনাও অন্য কারও একটিমাত্র চালেই ভেঙে পড়তে পারে। গল্পটি আধুনিক জীবনের কৌশলগত নিষ্ঠুরতাকে সূক্ষ্মভাবে তুলে ধরে।
