ছবি আঁকা হলো মেডিটেশন —রঙের ছোঁয়ায় মনের নির্মলতা।

আমাদের এই ব্যস্ত জীবনে মনকে শান্ত রাখা যেন এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। চারপাশে এত হট্টগোল, এত চাপ, যে মনে হয় কোথাও কোনও শান্তি নেই। আমরা সবাই খুঁজি সেই শান্তির ঠিকানা, কোনো না কোনো ভাবে। কেউ ধ্যানে বসেন, কেউ যোগব্যায়াম করেন, আবার কেউ প্রকৃতির মাঝে সময় কাটান। কিন্তু আমি আজ কথা বলব এক অন্য রকমের ধ্যানের বিষয়—যার নাম পেইন্টিং বা ছবি আঁকা।

হ্যাঁ, শুনতে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু পেইন্টিং কিন্তু শুধু শিল্প নয়, এটি এক গভীর ধ্যান। যখন আমি ক্যানভাসের সামনে বসি, তুলি হাতে নিই, আর রঙের টিউব খুলি, তখন যেন বাইরের পৃথিবীটা মিলিয়ে যায়। আর যা থাকে, শুধু আমি আর আমার রঙের জগৎ। এই মুহূর্তটাই হলো ধ্যানের আসল রূপ।

ধ্যান মানে কি? মনকে এক জায়গায় স্থির করা, চিন্তার ধারা থামানো, আর বর্তমান মুহূর্তটায় সম্পূর্ণভাবে উপস্থিত থাকা। পেইন্টিং ঠিক সেটাই করে। যখন আমি কোনো নীল আকাশ আঁকি, কিংবা কোনো সবুজ গাছের পাতা ফুটিয়ে তুলি, তখন সমস্ত মনোযোগ চলে যায় সেই রঙের মিশেলে, সেই ব্রাশের চাপে, সেই লাইন আর ছায়ার খেলায়। এই একাগ্রতাই হলো মেডিটেশন।

পেইন্টিংয়ের সময় কোনও নিয়ম নেই, কোনও বাঁধন নেই। আমি যা ইচ্ছে তাই আঁকতে পারি। ভালো-মন্দের বিচার নেই। সঠিক-ভুল নেই। এই স্বাধীনতাটাই মনকে এতটা মুক্ত করে দেয়। এটা এমন এক জায়গা যেখানে সৃষ্টিশীলতাকে কোনো রকম বিচারের ভয় ছাড়াই উড়তে দেওয়া যায়। আর এই উড়ানটাই আসলে মেডিটেশনের চরম অবস্থা।

আমাদের মনটা এক অদ্ভুত জিনিস। সারাক্ষণ ঘোরে—আগের ভুল নিয়ে, ভবিষ্যতের চিন্তা নিয়ে। এই দোলাচলেই আমাদের ক্লান্তি। কিন্তু যখন আমি পেইন্টিং করি, তখন মন বর্তমানে আটকে যায়। আমি শুধু এই রঙটাকে কীভাবে মাখাব, এই লাইনটাকে কীভাবে টানব, এই আলো-ছায়াটা কীভাবে ফুটিয়ে তুলব, এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকি। এই ব্যস্ততা কিন্তু ক্লান্তিকর নয়, এটা এক ধরনের প্রশান্তি।

আমি নিজেও অনেক সময় যখন অস্থির হয়ে পড়ি, বা কোনো বিশেষ চিন্তায় ডুবে থাকি, তখন তুলি হাতে তুলে নেই। কোনো পরিকল্পনা থাকে না। ইচ্ছেমতো রং মাখাই। কখনো মনে হয়, উঁচু পাহাড় আঁকি, আবার কখনো ঢেউ খেলানো সমুদ্র। এই সময়টায় নিজের অজান্তেই মন হালকা হয়ে যায়। যেন মনের ভেতরের সব আবর্জনা সরে যায়, আর জায়গা হয় এক নতুন সতেজতার।

পেইন্টিং শুধু পেশাদার শিল্পীদের জন্য নয়। যার হাতে তুলি থাকে, তার জন্য এই ধ্যান সম্ভব। আমি যদি ভাবি “আমি তো আঁকতে জানি না”, তাহলে সেটা প্রথমেই ভুলে যাওয়া দরকার। মনে রাখা ভালো, এখানে ড্রয়িং দক্ষতা নয়, এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো “অনুভব”। আমি যে রঙ নির্বাচন করবো, সেটা যেন আমার অনুভূতির প্রতিফলন। আমি দুঃখী হলে গাঢ় রং বেশি ব্যবহার করতে পারি, খুশি হলে হলুদ আর কমলা—আবার উল্টোটাও হতে পারে। এটা যেন আমার মনের আয়না।

চোখ বন্ধ করে ধ্যান যেমন শরীর ও মনকে শান্ত করে, পেইন্টিং তেমনই করে, তবে চোখ খোলা রেখে! এটি এক সচল ধ্যান। এখানে চোখ ও হাত সমানভাবে কাজ করে, আর মনের সমস্ত চঞ্চলতা একসময় থেমে যায়। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, পেইন্টিং করলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা কমে যায়, যা আমাদের স্ট্রেসের জন্য দায়ী। ফলে মন প্রফুল্ল হয়, ঘুম ভালো হয়, আর জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিও বদলে যায়।

সুতরাং, আজ থেকেই শুরু করা ভালো —দেরি না করে। তেল রং হোক, এক্রিলিক হোক, জলরং হোক, অথবা শুধু খড়ি আর কাগজ—যা হাতে পাই। কোনো প্রত্যাশা নয়, ভালো বা খারাপ হওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু রঙ মেশানো, তুলি চালানো, আর মনকে ভাসিয়ে দেওয়া রঙের ঢেউয়ে। ধীরে ধীরে শান্তির এক নতুন জগৎ তৈরি হয় মনের ক্যানভাসে—যা শুধু চিত্রকল্প নয়, মনের নির্মল ধ্যান।


Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।